রিভিউ: কবর কবিতা। কবি জসীম উদ্দিন। Review: Kobor Kobita
কবি জসীম উদ্দিনের ‘কবর’ কবিতার একটি বিশদ পর্যালোচনা
কবি জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন, যা গ্রাম বাংলার চিরায়ত দুঃখ, স্মৃতি ও ভালোবাসার এক মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরে। ১৯২৫ সালে রচিত এবং তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’তে প্রকাশিত এই কবিতাটি জসীমউদ্দীনের অন্যতম জনপ্রিয় সৃষ্টি। এর সহজবোধ্য ভাষা, গভীর আবেগ এবং হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা পাঠককে সহজে আকৃষ্ট করে। প্রায় ১০০ বছর পরেও কবিতাটি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে যায়। এই কবিতার একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা নিচে দেওয়া হলো।
![]() |
| পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের কবর কবিতার রিভিউ |
১. কবিতার পটভূমি ও বিষয়বস্তু:
‘কবর’ কবিতাটি একজন বৃদ্ধের স্মৃতিচারণামূলক দীর্ঘশ্বাস। তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রী, সন্তান, এবং নিকটাত্মীয়দের কবরের পাশে বসে তাদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা এবং তার নিজের একাকীত্বের বেদনা প্রকাশ করেন। কবিতাটি মূলত গ্রামীণ জীবনের সরলতা, দুঃখ, কষ্ট, অভাব এবং একই সাথে ভালোবাসার এক চিরন্তন চিত্র। বৃদ্ধের স্মৃতিচারণায় আমরা দেখতে পাই কিভাবে জীবন তাকে একে একে প্রিয়জনদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে এবং কিভাবে তিনি একা হয়ে গেছেন। তার প্রতিটি স্মৃতি প্রিয়জনদের হারানোর বেদনায় ভরা।
২. চরিত্রায়ন ও আবেগ:
কবিতাটির প্রধান চরিত্র একজন বৃদ্ধ কৃষক, যিনি তার পরিবারের সদস্যদের জন্য শোকাহত। তিনি তার স্ত্রীকে ‘রাখালীর মেয়ে’ বলে সম্বোধন করেন, যা তাদের গ্রামীণ জীবনের সরলতা ফুটিয়ে তোলে। তার স্মৃতিতে উঠে আসে স্ত্রীর সাথে তার প্রথম দেখা, তাদের সুখ-দুঃখের জীবন, সন্তানদের জন্ম ও মৃত্যু, এবং সবশেষে তার নিজের একাকীত্ব। বৃদ্ধের প্রতিটি কথায় তার প্রিয়জনদের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং তাদের হারানোর বেদনা সুস্পষ্ট। বিশেষ করে, তার শিশুপুত্রদের মৃত্যুর বর্ণনা এবং তাদের জন্য তার শোক পাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
৩. ভাষা ও শৈলী:
জসীমউদ্দীন ‘কবর’ কবিতায় অত্যন্ত সহজ, সরল এবং সাবলীল ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি গ্রাম বাংলার প্রচলিত শব্দাবলী, উপমা ও চিত্রকল্প ব্যবহার করে গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত ছবি এঁকেছেন। তার ভাষা এতই সহজ যে, যেকোনো সাধারণ পাঠকও তা সহজেই বুঝতে পারে। তার কবিতার প্রতিটি পংক্তি যেন পাঠকের হৃদয়ে গেঁথে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, তিনি তার স্ত্রীকে হারানোর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে:
“যেখানে ঘুমিয়ে আছে রাঁখালীর মেয়ে
সেখানে আমার অনেক দিনের সুখ-দুখের স্মৃতি লেগে আছে।”
তার শিশুপুত্রদের মৃত্যুর বর্ণনা:
“হায়রে খোকা, তোর সে হাসি, তোর সে খেলা
একলা ফেলে গেলি, গেলি না কেন?”
এই পংক্তিগুলি পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং বৃদ্ধের শোক ও বেদনাকে সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
৪. গ্রামীণ জীবনের চিত্রণ:
জসীমউদ্দীনকে ‘পল্লীকবি’ বলা হয়, এবং ‘কবর’ কবিতা তার এই উপাধির যথার্থতা প্রমাণ করে। কবিতাটিতে গ্রাম বাংলার প্রতিটি উপাদান বিদ্যমান – সবুজ শস্যক্ষেত্র, রাখালী, কুঁড়েঘর, অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট, এবং সরল গ্রামীণ মানুষ। তিনি গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। এই কবিতা যেন গ্রামীণ বাংলাদেশের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
৫. মৃত্যুচেতনা ও অমরত্ব:
কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু হলো মৃত্যু। বৃদ্ধ একের পর এক তার প্রিয়জনদের হারিয়েছেন – স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনি। এই মৃত্যুগুলি তাকে একাকীত্বের গভীরে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু একই সাথে, কবিতাটি মৃত্যুর পরেও ভালোবাসার অমরত্বের কথা বলে। বৃদ্ধের স্মৃতিতে তার প্রিয়জনরা অমর হয়ে আছে। যদিও তারা শারীরিক ভাবে উপস্থিত নেই, তাদের স্মৃতি তার হৃদয়ে চিরকাল জীবন্ত থাকবে। এই কবিতাটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভালোবাসা মৃত্যুঞ্জয়ী।
৬. লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির প্রভাব:
জসীমউদ্দীন লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ‘কবর’ কবিতায় আমরা এই প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাই। কবিতার ভাষা, উপমা, চিত্রকল্প এবং বর্ণনাশৈলী বাংলার লোককাহিনীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি গ্রামীণ মানুষের মুখের ভাষা ব্যবহার করে কবিতাটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছেন।
৭. সামাজিক ও মানবিক বার্তা:
‘কবর’ কবিতাটি কেবল ব্যক্তিগত শোকগাথা নয়, এটি সমাজের দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের এক করুণ চিত্র। দারিদ্র্য, অনাহার, এবং চিকিৎসা সুবিধার অভাবে কিভাবে গ্রাম বাংলার শিশুরা অকালে ঝরে যায়, সেই মর্মান্তিক বাস্তবতা কবিতাটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটি একটি মানবিক আবেদনও বটে, যা মানুষকে ভালোবাসার মূল্য এবং জীবনের ক্ষণস্থায়ীতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
৮. কবিতার ছন্দ ও শব্দব্যবহার:
কবিতাটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত, যা এটিকে একটি নির্দিষ্ট গতি ও তাল প্রদান করে। জসীমউদ্দীন শব্দের ব্যবহারেও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তিনি এমন শব্দ চয়ন করেছেন যা শুধুমাত্র অর্থের দিক থেকেই নয়, শ্রুতির দিক থেকেও মন মুগ্ধ করে। যেমন – "কান্নাজলে" "ছলছল" "হাহাকার" "আঁধার" – এই শব্দগুলো কবিতার বিষাদময় পরিবেশকে আরও গভীর করে তোলে।
৯. কবিতার স্থায়ী প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা:
প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ‘কবর’ কবিতা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এর কারণ হলো এটি মানুষের চিরন্তন আবেগ – ভালোবাসা, শোক, স্মৃতি এবং একাকীত্ব – নিয়ে কথা বলে। এই আবেগগুলি দেশ, কাল, পাত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। কবিতাটি এখনও বাঙালি পাঠককে কাঁদাতে পারে, তাদের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটতে পারে। এটি বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী সৃষ্টি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পঠিত ও প্রশংসিত হবে।
১০. শেষ কথা:
কবি জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতাটি একটি অনন্য সাহিত্যকর্ম। এর সরলতা, গভীরতা, আবেগ এবং মানবীয় আবেদন এটিকে বাংলা সাহিত্যের একটি অবিস্মরণীয় স্থান করে দিয়েছে। এটি কেবল একটি কবিতা নয়, এটি গ্রাম বাংলার জীবন, মৃত্যু, ভালোবাসা এবং স্মৃতিচারণের এক জীবন্ত দলিল। এই কবিতাটি পাঠ করে পাঠক কেবল আনন্দই পান না, বরং জীবনের গভীর অর্থও উপলব্ধি করেন। ‘কবর’ কবিতা নিঃসন্দেহে জসীমউদ্দীনের শ্রেষ্ঠ রচনার একটি এবং বাংলা সাহিত্যের এক চিরন্তন সম্পদ।
